adimage

২২ জানুয়ারী ২০১৮
বিকাল ০৪:২৬, সোমবার

সচেতনতাই দিতে পারে মুক্তি

আপডেট  10:26 AM, জানুয়ারী ১৪ ২০১৮   Posted in : সম্পাদকীয়    

সচেতনতাইদিতেপারেমুক্তি

ঢাকা ১৪ জানুয়ারীবাংলাদেশে চাকরিজীবীদের কর্মসন্তুষ্টি কতটুকু; কর্মক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহমর্মিতা কতটুকু; বৈষম্য বা অন্যান্য কারণে বিশেষ করে নারীরা চাকরি ছাড়তে বা পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছেন কি-না; তাদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা রয়েছে কি-না; সব মিলিয়ে বাংলাদেশের কর্মক্ষেত্র কতটুকু কর্মোপযোগী, তা নিয়ে ভাবনার সময় এসেছে। প্রতিষ্ঠানের উত্পাদনশীলতা, উন্নতি, অবনতি ও চাকরিজীবীর কর্মসন্তুষ্টির সাথে সম্পৃক্ত কর্মক্ষেত্রে মানসিক সুস্থতার বিষয়টি। গেল বছরে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্যও ছিল ‘কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য’। এ নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির অংশ হিসেবে গত অক্টোবরে পেশাজীবীদের কাছে লেখা আহ্বান করে আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা ‘অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গার (এসিএফ)’। এতে বিপুল সাড়া মেলে। এ সব লেখনীতে কর্মক্ষেত্রের অন্যতম সমস্যা হিসেবে উঠে আসে মানসিক চাপ ও হয়রানি।

প্রতিষ্ঠানের ভালো-মন্দ যাদের উপর নির্ভর করে, সেই সব কর্মী ভালো থাকছেন কি-না, সেদিকে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের খেয়াল রাখাটা জরুরি। কিন্তু দেখা গেছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে জরুরি পারিবারিক প্রয়োজনেও কর্মীকে ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলে ওই কর্মীর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি একটা কষ্ট বা ট্রমা তৈরি হতে পারে। একজন লিখেছেন, ‘... (গুরুতর ঠোঁট কেটে ফেলা) আমার মেয়ের দ্রুত সার্জারি বিশেষজ্ঞকে দেখানো প্রয়োজন। তাকে মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ম্যানেজারের কাছে এক ঘন্টা আগে অফিস ত্যাগ করার অনুমতি চাইতেই তিনি বললেন, চাকরি বাদ দিয়ে বউ-বাচ্চার সেবা করেন। ... আজ এতবছর পর মেয়ের দিকে যখনই তাকাই, মনে পড়ে সেই দিনের কথা, সব কিছুর জন্য নিজেকে দোষারোপ করি’।

অনেক কর্মক্ষেত্রে নারীকে সহকর্মী হিসেবে দেখা হয় না। তার প্রতি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা যেন আমাদের পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নৈমিত্তিক ব্যাপার। অনেক সময় নারীরা হয়রানিরও শিকার হন। যার রেশ তার পরিবার ও পারিপার্শ্বিকতাকেও ছাপিয়ে যায়। এর ফলে মানসিক বিপর্যয়ে পড়েন অনেকে। যেমন, একজন তার কর্মজীবী মায়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছেন এভাবে, ‘আমি দেখেছি, পুরুষ সহকর্মীরা গভীর রাতে ল্যান্ডফোনে কিভাবে আমার মাকে উত্ত্যক্ত করতেন। আমার মা ছিলেন মাঠ পর্যায়ের কর্মী। বিভিন্ন অফিসে গিয়ে তার নামে বাজে কথাও বলে আসতেন সহকর্মীরা’।

অনেক কর্মক্ষেত্রেই কর্মীদের নির্দিষ্ট বেতন কাঠামো নেই। কর্মী নিয়োগ ও তাকে মূল্যায়নে কোনো নিয়ম-নীতিরও তোয়াক্কা করা হয় না। কর্মীও নিজের অধিকার রক্ষায় অসহায় বোধ করেন। এর ফলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নির্যাতন ও হয়রানি করার সুযোগ পান। কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি তাদের একেবারেই অজানা। একজন জানিয়েছেন, ‘অফিসটাইম শেষ হওয়ার পরও আমাকে বসিয়ে রাখতো। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে থাকতাম। এক ঘণ্টাকে ২০ ঘণ্টা মনে হতো। দেখা যেত সারাদিন কোনো কাজ নেই। অফিস টাইমের পর অনেক কাজ নিয়ে হাজির। মনে হতো, আমাকে কষ্ট দেওয়ার জন্যই এসব। কখনও কখনও আমি কাঁদতাম। এই জন্যই কি পৃথিবীতে এসেছি! বিষয়টা কারো সাথে শেয়ারও করতে পারতাম না।’ কর্মক্ষেত্রে দায়িত্বের সুষ্ঠু বণ্টন না থাকায় নিজের কাজের বোঝা অন্যকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এক কর্মজীবী লিখেছেন, ‘আমাকে বলা হতো, আপনাকে সব করতে হবে, আপনি বের করেন কিভাবে সব ম্যানেজ করবেন। দরকার পড়লে বাসায় গিয়েও অফিসের কাজ করতে হবে। বাসায় গিয়েও আমার সুপারভাইজারের ফোন পেতাম এবং তিনি ওনার কাজ আমাকে দিতেন।’ অনেকে আবার নারী সহকর্মীর সাথে অস্বস্তিকর আচরণ বা কটূক্তিপূর্ণ কথা বলে থাকেন। এর ফলে ঝুঁকির মধ্যে পড়ে নারী কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্য।

আমাদের সমাজে মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যাপারে কিছু কুসংস্কার রয়েছে। মনে করা হয়, মানসিক সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি বা যিনি মানসিক স্বাস্থ্য সেবা নিচ্ছেন, তারা কাজে-কর্মে অক্ষম। অথচ বাস্তবতা হলো, কোনো না কোনো মানুষ জীবনের কোনো না কোনো সময়ে মানসিক অবসাদগ্রস্ততা বা উদ্বিগ্নতার মধ্য দিয়ে যেতে পারেন। অন্যান্য সমস্যার মতো সুচিকিত্সার মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যক্তি কর্মক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সুস্থ ব্যক্তির চাইতেও বেশি কর্মদক্ষতা দেখাতে পারেন তিনি। সেফ ওয়ার্ক অস্ট্রেলিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সেদেশে সবচেয়ে বেশি মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন নিরাপত্তা সদস্য, কারারক্ষী, পরিবহন চালক এবং স্বাস্থ্য ও সমাজ কর্মীরা। বিশেষ করে পুলিশ, জরুরি সেবাকর্মী ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে বিষণ্নতা, উদ্বেগজনিত সমস্যা ও আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি দেখা দিতে পারে। এটা অস্ট্রেলিয়ার হিসাব। আমাদের দেশেও এ নিয়ে গবেষণা সাপেক্ষে গুরুত্ব অনুধাবন এবং সে অনুযায়ী নীতি-নির্ধারণ ও সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় থাকতে হবে পরিষ্কার নীতি। পাশাপাশি থাকতে হবে কর্মীদের বিনোদনমূলক ব্যবস্থাও।

উন্নত বিশ্বের শ্রম ব্যবস্থাপনায় মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষার বিষয়টিতে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এক্ষেত্রে সবার আগে প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা। তাহলে প্রতিষ্ঠান ও কর্মী উভয়েই লাভবান হবে। কর্মীরা যথাযথভাবে মানসিক চাপ মোকাবিলা করে নিজের ও অন্যের মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি খেয়াল রাখতে পারবেন। সুস্থ, স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে কর্মীর বিশ্রাম ও তার জীবনযাপনের মানের প্রতিও লক্ষ রাখতে হবে। ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষার পাশাপাশি ভালো কাজের পুরস্কার দিতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা দিতে হবে। সেক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞানীদের বা মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ, রাগ নিয়ন্ত্রণ, আত্মবিশ্বাস অর্জন, বুলিং প্রতিরোধ নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সারাবিশ্বে কেবল বিষণ্নতায় ভুগছে ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ, যা অক্ষমতার প্রধান কারণ। একই সাথে তাদের অনেকের মধ্যেই উদ্বেগজনিত উপসর্গও দেখা যায়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা আরো বলছে, বিষণ্নতা ও উদ্বেগজনিত সমস্যায় বিশ্ব অর্থনীতিতে ক্ষতি হয় প্রায় এক ট্রিলিয়ন বা এক লাখ কোটি মার্কিন ডলার। যেসব কর্মস্থল মানসিক স্বাস্থ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য সেবাকে গুরুত্ব দেয়, সে সব প্রতিষ্ঠানের উত্পাদনশীলতা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে মালিক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ ও কর্মী সবাইকে তাই সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে, কর্মস্থলের নেতিবাচক পরিবেশের কারণে জেন্ডার-সমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে সরকারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা যেন বাধাগ্রস্ত না হয়।


সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul