adimage

২৪ এপ্রিল ২০১৮
সকাল ১১:১০, মঙ্গলবার

আত্মতা নিয়ে কেন এত উদাসীন বাংলাদেশের চিরহিতৈষী প্রণব?

আপডেট  10:26 AM, জানুয়ারী ১৪ ২০১৮   Posted in : সম্পাদকীয়    

আত্মতানিয়েকেনএতউদাসীনবাংলাদেশেরচিরহিতৈষীপ্রণব?

ঢাকা ১৪ জানুয়ারীআগে ঘণ্টায় ১৩ কিলোমিটার বেগে প্রতিদিন সকালে হাঁটতেন। হঠাত্ গতিবেগ কিছুটা নেমে আসতেই পারিবারিক ডাক্তারকে তার ফোন— কী ব্যাপার, এরকম কেন হচ্ছে? ফোনের ওপার থেকে হাসি ছড়িয়ে ডাক্তারের সনম্র উত্তর—স্যার আপনার বয়সটার হিসাব তো রাখতে হবে। ৮৩ পেরিয়ে আপনি এখন ৮৪ দিয়ে (জন্ম ১১ ডিসেম্বর, ১৯৩৫) শতবর্ষের দিকে এগোচ্ছেন, সম্ভবত আরো এগোবেন। কথাটা শুনলেন, ভাবলেন, পরদিন ভোর থেকে হাঁটাহাঁটির মেজাজ দ্রুত বেড়ে গেল।

এই হলো, ভারতের প্রথম বাঙালি আর ত্রয়োদশ রাষ্ট্রপতি (জুলাই ২০১২-২২ জুলাই ২০১৭) শ্রীযুক্ত প্রণব মুখোপাধ্যায়ের মনোবল আর দৈহিক গতিশীলতার সাম্প্রতিক একটি দৃষ্টান্ত। দিনগুলো রাতগুলো ক্রমাগত সামনে এগোচ্ছে, যথানিয়মে বয়সও তার হাঁটছে। কিন্তু বয়সের হিসাব নিয়ে, ভার নিয়ে তথাকথিত বার্ধক্য নিয়ে বিলকুল ভাবনা নেই। ভোরে ঘুম থেকে উঠে যোগাসন, খালি হাতে ব্যায়াম, এক নাগাড়ে হাঁটাহাঁটি ঘরে ফিরে দীর্ঘক্ষণ একান্ত উপাসনা, বইপড়া, লেখালেখি, দুপুরে বিশ্রাম, বিকেলে লোকজনের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত্, কখনো সভার পর সভা, সভায় আত্মকথনহীন সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা, প্রকাশ্যে অন্তরঙ্গ আড্ডা, আলোচনা গৃহে এসে নিয়মিত রুটিনে ফেরা, চেনা অচেনা যে কারো ফোন ধরে কথাবার্তা এবং গভীর রাত পর্যন্ত নানা ধরনের বইপাঠ তার নিত্যদিনের অভ্যাস। নিয়মের ভেতরে প্রয়োজনে নিয়মভাঙা, আবার দ্রুত নৈমিত্তিক সূচিতে ফিরে আসার এরকম নিভৃত উদ্ভাস সচরাচর দেখা যায় না। এখানে, এখানেও প্রণববাবু আরেক উজ্জ্বল ব্যক্তিক্রম। তার সঙ্গলাভে তার বিকশিত স্নেহে আমরা অনেকেই ধন্য, কৃতার্থ তার বহুমাত্রিক উত্তরণের নানা পর্বে। তার প্রায় বিস্ময়কর প্রজ্ঞার রাজনৈতিক, প্রশাসনিক পরিচয় অনেকেই খানিকটা জানে, জানে সমসাময়িক বিশ্ব, কিন্তু এক প্রণবের ভেতরে একাধিক প্রণবের ব্যক্তিত্বের বিবর্তন সম্পর্কে আমাদের জ্ঞান খুব সীমিত, এখনো তার ধারাবাহিক বিকাশ বিশেষ আর নির্বিশেষের জানার বাইরে পড়ে আছে। এ বিষয়ে কয়েকটি অসুবিধা অস্বীকার করা অসঙ্গত। প্রথমত, জীবদ্দশায় যে কোনো ব্যক্তিস্বরূপের নৈর্ব্যক্তিক মূল্যায়ন সহজ কাজ নয়। সময় নানা প্রশ্ন তোলে, তোষামোদ আর ব্যক্তিপূজার সংকুচিত বিশ্বাস সমসাময়িক ব্যক্তিকে নিয়ে কথাবার্তা বা লেখালেখির অভিপ্রায়কে প্রায়ই ঘিরে ধরে। দ্বিতীয়ত যাকে নিয়ে লিখব, ভাবব, তার নীরব গাম্ভীর্য, তার এক ধরনের অনীহা, সচেতন আত্মতাও অন্তরায় তৈরি করে। হ্যাঁ তিনি নিজে যদি লেখেন, তাকে নিয়ে লেখার ভাববার অবারিত সুযোগ দেন, তাহলে তাকে নিয়ে সমসাময়িকের চর্চা সহজতর হয়ে ওঠে। ভবিষ্যতের ইতিহাসও প্রয়োজনীয় প্রাথমিক উপাদানের উেস প্রবেশ করার সুযোগ পায়। এজন্যই কেউ কেউ তার ব্যক্তিজীবনের খুঁটিনাটি, ভাবনাচিন্তা সবই লিখে রাখেন, আত্মজীবনী বা স্মৃতিচারণের আদলে। যেমন লিখেছেন, পণ্ডিত জওহরলাল নেহেরু, নীরদ সি চৌধুরী, মীর মশাররফ হোসেন, পাবলো নেরুদা, বার্ট্রান্ড রাসেল, চার্চিলসহ বহু গুণী বহু মনীষী যারা ইতিহাস তৈরির নেপথ্য প্রকাশ্য নায়ক নন শুধু, ভবিষ্যতেরও নিখুঁত কারিগর। প্রায় ৬০ বছরের রাজনীতি আর ৪৮ বছর জুড়ে ভারতীয় সমাজের মনোযোগী পর্যবেক্ষক, দর্শক, দক্ষ প্রশাসক প্রণববাবু তাঁর ব্যক্তিকেন্দ্রিক বৃত্তান্ত লেখেননি, নিজেকে যথাসম্ভব আড়ালে রেখে লিখেছেন তাঁর রাজনৈতিক আত্মজীবনী, তিন পর্যায়ে, যেখানে তিনি প্রবল নিরপেক্ষ, কিন্তু নিজের সম্পর্কে একান্ত উদাসীন। চূড়ান্ত আত্মহীন। এই নৈর্ব্যক্তিকতার, আমিহীনতার কারণ কী? নিজের আমি’র নিহিত আমিকে খুঁজে দেখার দায় কি রবীন্দ্রনাথের আদর্শে প্রাণিত হয়ে ভাবিকালের ইতিহাসের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন তিনিও? সম্ভবত এটাই তাঁর মনন আর মননশীলতার সক্রিয় অভিমুখ। তাঁর এই সংযম, তাঁর এই স্থিতধী, ধারাবাহিক মনস্বিতা প্রচারমুখী কোলাহলের ভিড়ে অবশ্যই বিরল দৃষ্টান্ত। তবু আমরা, যাঁরা তাঁর গুণমুগ্ধ, যাঁরা কখনো কখনো কাছে আসার সুযোগ পেয়েছি, কখনো নৈকট্যবোধকে সচেতনভাবে এড়িয়ে তাঁর শৈশবের, তাঁর হয়ে-ওঠার, তাঁর প্রথমপর্বের রাজনীতি আর সমাজসেবার কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পরিচিত হতে চাই, তাঁর নির্ণীত আদর্শের বিস্তৃত বিন্যাসের স্বপ্ন দেখি, বা লিখতে চাই ভারতীয় বাঙালির ‘প্রথম নাগরিক’-এর জীবনকথা—তাঁদের ভাবনা-চিন্তা, তাঁদের পরিকল্পিত লেখালেখির প্রাথমিক সূত্র (প্রাইমারি সোর্স) আর উপাদানের রসদ জোগাবেন কে? প্রণববাবুর বাইরে দ্বিতীয় কারো পক্ষে এসব সত্যরূপের সন্ধান দেওয়া কি সম্ভব? এই যে, বীরভূমের মিরাটি গ্রামের বাসিন্দা আর সবার মান্য কংগ্রেস নেতা কামদা কিঙ্কর মুখোপাধ্যায় ও শ্রীমতী রাজলক্ষ্মীর সন্তান পল্টু ওরফে প্রণবের শৈশব কেটেছে কীভাবে, কেন ছাত্ররাজনীতি করতে করতে, আত্মনিষ্ঠ যুবক কংগ্রেস রাজনীতির বাইরে বেরিয়ে বাংলা কংগ্রেসের সক্রিয় সদস্য হয়ে উঠলেন; সিউড়ির বিদ্যাসাগর কলেজে পড়লেন বাংলা অনার্স নিয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্টবিজ্ঞান আর ইতিহাস নিয়ে এম.এ. করলেন; আইনবিষয়ক ডিগ্রি ধারণকেও গুরুত্ব দিলেন; নিয়মমাফিক লেখাপড়া শেষে বেছে নিলেন পোস্ট ও টেলিগ্রাফ অফিসের কেরানির পেশা; পরে ৬৩ সালে, উত্তর ২৪ পরগণার বিদ্যানগর কলেজে অধ্যাপনা; ছড়াকার এখলাস উদ্দিন আহমেদ আর স্বপ্না দেব-দের সঙ্গে সাক্ষরতা অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়া—এরকম বহু ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের লক্ষ্য ও একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার রহস্য কী? নিজের লেখাপড়ার পছন্দকে (চয়েস অব এডুকেশন) ঘিরে কিছুদিন আগে খোলামেলা আড্ডায় তিনি বলেছেন, এ ব্যাপারে আমি ছিলাম স্বেচ্ছাচারী। সত্যিই কি এটা তাঁর স্বেচ্ছাচার? না ব্যক্তিপছন্দের বহুমাত্রিকতার সূচনা? অমর্ত্য সেন সামাজিক পছন্দকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে, ব্যক্তির স্বনির্বাচিত পছন্দের ওপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করেছেন। আমাদের ধারণা, সমাজবিজ্ঞানের সনিষ্ঠ পাঠক, পরে নিখাদ পর্যবেক্ষক প্রণববাবু ব্যক্তিগত পছন্দকে সুগঠিত করতে করতে বৃহত্তরের পছন্দকে যুক্ত করেছেন নিজের কর্মে এবং কালক্রমে সংগঠিত রাজনীতিকে, রাজনীতির বহুত্বময় সাধনাকে তাঁর বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছেন। বিশ্বাসের এই ভরসাই সম্ভবত তাঁর পরবর্তী সমস্ত উত্তরণের উত্স। এসব পর্বে তিনি যেমন নিষ্কলঙ্ক, স্বতঃস্ফূর্ত, তেমনি দুঃসাহসী, ঝুঁকিপূর্ণ তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ। কেউ তাঁকে পাইয়ে দেয়নি, যা কিছু অর্জন, সবই নিজস্ব, স্বতন্ত্র ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িত। ঐতিহ্য বলতে শুধু ভাষা, ধর্মের কথা বলছি না আমরা। মাটির সঙ্গে, শিকড়ের সঙ্গে, অখণ্ড বাংলার লোকায়ত আর ভারতীয় মিশ্র সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর একাত্মতাবোধের সংশয়হীন অবস্থাকে অনুভব করছি। এ অবস্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে যেমন বাঙালির চার হাজার বছরের ইতিহাস, তেমনি মহাভারতের কথা-উপকথার বিস্তৃত পটভূমি। ৮ জানুয়ারি, প্রণব তাঁর আবাল্য বন্ধু অমল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে অন্তরঙ্গ আলাপের মুহূর্তে এই প্রজন্মকে দুটি পরামর্শ দিয়েছেন। বলেছেন, কখনো নিজের শিকড়কে ভুলে যাওয়া চলবে না। একথা বলেই তাঁর দার্শনিক, প্রগাঢ় উচ্চারণ— ‘মানুষ মাটিতে যখন আচমকা পড়ে যায়, তখন সে মাটিকে ছুঁয়ে, মাটিকে আঁকড়ে ধরে উঠে দাঁড়ায়।’ এই মাটিই তাঁর ভাষায়, মানুষের শিকড় আর তাদের পরম অবলম্বন। ২০১৭ সালের ২২ জুলাই যেদিন ভারতীয় সংসদের দুই সভার সদস্য, বিশিষ্টজন আর বিদেশি কূটনীতিকদের উপস্থিতিতে তাঁকে বিদায় সংবর্ধনা জানানো হলো, সেদিন ঋদ্ধ ভঙ্গিতে প্রায় একই বার্তা পেশ করলেন সাম্প্রতিক বিশ্বের অন্যতম সেরা রাষ্ট্রনেতা। বললেন, ‘দিল্লিতে যখন প্রথম আসি, ৬৯ সালের জুলাই মাসে, তখন আমি নিঃসঙ্গ, কেউ আমাকে চেনে না, বাংলা কংগ্রেসের টিকিটে, রাজ্যসভার নির্বাচিত সংসদের প্রশংসাপত্র আমার একমাত্র পরিচয়, ওটা দেখিয়েই সংসদে প্রবেশ করলাম। আর আজ অসংখ্য চেনা অচেনা মুখ আমাকে বিদায় জানাচ্ছে, করতালি আর শুভেচ্ছায় পূর্ণ করে, আমি ফিরে যাচ্ছি সেই মাটির কাছে, মানুষের কাছে, যাঁরা আমার শিকড়ের সঙ্গী আর  অখণ্ড আত্মীয়।’

মানুষকে শিকড়ের সহযোগী, সহযাত্রী ভাববার মতো চিত্তের এরকম বিত্ত আমাদের কজনের আছে? এ বিষয়ে খামতি আছে বলেই আমরা খণ্ডিত, অনৈক্যের কলরবে মুখরিত, অসহিষ্ণুতা আর পরশ্রীকাতরতায় এক ধরনের গৃহবন্দি। প্রণববাবুর মতো প্রাজ্ঞ, দর্শনসমৃদ্ধ, মুক্তচিন্তার দিশারীর সময়ে আমরা বেঁচে আছি, এটা আমাদের সৌভাগ্য। সৌভাগ্যের জ্যোতি তখনই আরো প্রশস্ত, আরো দীর্ঘ হবে, যখন সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাসের বর্বরতাকে হাতে হাত রেখে রোখার চেষ্টা করব— বলব, সাংস্কৃতিক দেশভাগ নয় আর। বলব, বঙ্গসাহিত্য সম্মেলনের মতো বহু পুরনো সাংস্কৃতিক মঞ্চের বিবর্তন আর তাঁর রূপান্তরিত চেহারা ‘আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলন’ই আমাদের সবার শিকড় সন্ধানের আরেক আশ্রয়। সেই শিকড়ের খোঁজে, প্রধান অতিথির আসনকে আলোকিত করতে আজ ১৪ জানুয়ারি, আত্মহীন, আমিত্বহীন প্রণব মুখার্জি, আমাদের প্রণবদা ঢাকায় আসছেন। তাঁর সফর নিয়ে উচ্ছ্বাস আছে, থাকবে আইনের কড়াকড়ি, তবু তিনি নিয়ম মেনে নিয়ম ভাঙবেন। দুই বাংলার সাংস্কৃতিক অখণ্ডতাবোধের পথে যে-সব কাঁটা আছে, এসব আবর্জনা আর ক্ষুদ্রতাকে সরিয়ে ফেলার স্বপ্ন ছড়াবেন। মেলাবেন নির্বিশেষের ইচ্ছাকে। এই লেখক তাঁর সফরসঙ্গী নয়। নিছক একজন দর্শক। যাঁর অতিরিক্ত আবেগ নেই, রয়েছে আবহমান বাঙালির ভাবাবেগ; আর এই স্বচ্ছতা আর হূদ্যতা স্পর্শ করেই সে আন্তর্জাতিক বাংলা সাহিত্য সম্মেলনের প্রথম সমাবেশের পশ্চিমবঙ্গীয় সংগঠক ও পৃষ্ঠপোষক সত্যমরায় চৌধুরীকে অভিনন্দন জানাচ্ছে। সত্যমকে বাংলাদেশে চেনে। চেনে তাঁকে বিশ্ব বাঙালির সাংস্কৃতিক নানা মঞ্চ। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের দুর্যোগময় মুহূর্তে যশোরের আখ ক্ষেতে, হুগলির চন্দননগরের বাসিন্দা, বালক সত্যমের ৭ দিন লুকিয়ে থাকার জেদ আর লড়াইয়ের কাহিনি আমরা অনেকেই জানি না। জানব পরে, ভিন্নধর্মী অন্য লেখায়।


সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul