adimage

২২ অক্টোবর ২০১৮
সকাল ০৫:০৬, সোমবার

আর কেউ যেন গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি না যায়

আপডেট  08:23 PM, Jun ০৪ ২০১৮   Posted in : জাতীয় প্রবাস বাংলা    

আরকেউযেনগৃহকর্মীহিসেবেসৌদিনাযায়

ঢাকা, ৫ জুন : সারা দিনরাত কাজ করাতো। খেতে দিত না। খাবার চাইলে মারধর করত। বেতন চাইলেও মারত। দেশে আসতে চাইলে মেরে অন্য বাসায় বিক্রি করে দিত। এক মালিকের বাড়িতে বেতন চাইলে স্বামী ও স্ত্রী দু’জন মিলে ব্যাপক মারধর করে। মরে গেছি মনে করে বাড়ির সামনের রাস্তায় ফেলে দেয়। পরে সৌদি পুলিশ উদ্ধার করে নিয়ে যায়।— এগুলো সৌদি আরবে গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে নির্যাতিত হয়ে ফিরে আসা কিশোরগঞ্জের কুলসুম বেগমের (ছদ্মনাম) কথা।
 
গত রবিবার রাত আটটা ২০ মিনিটে সৌদি আরবের এয়ার এরাবিয়া এয়ারলাইন্সের একটি বিমানে করে কুলসুমসহ নির্যাতনের শিকার ৩০ জন নারীকর্মী দেশে ফিরেছেন। এর আগে গত ১৫ মে সৌদি আরব থেকে নির্যাতনের শিকার আরো ৪০জন গৃহকর্মী দেশে ফিরেন। স্বপ্ন নিয়ে তারা  দেশ ছেড়েছিলেন। সৌদি আরব গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে। আর ফেরত আসলেন পলিথিন ভরা কয়েকটি ছেঁড়া কাপড় নিয়ে। ইমিগ্রেশন শেষ হওয়ার পর বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার সময় তাদের চোখে ছিল অশ্রু। নিজেদের আড়াল করতে তারা মুখমন্ডল কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখেন। এর মধ্যে কেউ কেউ ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন। বলছিলেন, ‘ছবি, ভিডিও করে কী করবেন? পারলে অন্য নারীদের সৌদি যাওয়া ঠেকান। আর কেউ যেন গৃহকর্মী হিসেবে সৌদি আরব না যায়।  আটকে পড়া নারীদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করেন।’
 
ওই নারীরা সৌদি আরবের রিয়াদে বিভিন্ন বাড়ির গৃহকর্তা ও তাদের স্ত্রীদের মাধ্যমে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। পরে তাদেরকে দেশটির ‘সফর’ জেলে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে তাদের দেশে পাঠানো হয়।  রবিবার দেশে ফেরা নির্যাতনের শিকার  নারীদের বাড়ি ঢাকা, কুমিল্লা, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরিশাল, যশোর, হবিগঞ্জ ও গোপালগঞ্জে বলে জানা গেছে।
 
সৌদি ফেরত নারীরা জানিয়েছেন, দেশটির বাসাবাড়িতে কাজ করতে গিয়ে তারা বিভিন্নভাবে নির্যাতনের শিকার হন। কাজ করার পর তারা কোনো ধরনের বেতন পাননি। উল্টো বেতন চাইতে গিয়ে মারধর, শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বাধ্য হয়ে তারা বাসা বাড়ি থেকে পালিয়ে যান এবং বাংলাদেশের আশ্রয় কেন্দ্রে তাদের রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে তারা দেশে ফেরেন।
 
দুই মাস আগে সৌদিতে এক দালালের মাধ্যমে যান কুলসুম। সেখানে গিয়ে তিনি যে বাসায় কাজ করেন সে বাসার মালিক ও তার স্ত্রী তাকে সারাদিন রাত কাজ করাতেন। আর কাজ করে মাসের শেষে বেতন চাইলে তাকে মারধর করা হতো। দু মাস কাজ করলেও তাকে কোনো বেতনই দেওয়া হয়নি।
 
শুধু তাই নয়, বাসার মালিকের কাছে বেতন চাওয়ায় মারধর করে তাকে ২৫ হাজার রিয়েলে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছিল। সেখানে মারধর করে তাকে রাস্তায় মৃত ভেবে ফেলে দেয়া হয়।
 
তিনি আরও জানান, বেতন চাইলে মালিক তাকে বলতেন, তোকে দুই বছরের জন্য ২৫ হাজার রিয়েলে কিনে আনছি। কুলসুম বলেন, বাড়িতে ফোন দিতে চাইলে ফোন দিতে দিতো না। খালি মারত। আমরা তো গেছিলাম সুখের জন্য। কিন্তু সুখ তো কপালে জুটলো না। রবিবার রাতে তিনি যে দেশে ফিরেছেন তখন পর্যন্ত খবরটি পায়নি তার পরিবার। তিনি বলেন, রাতে কোথায় থাকব জানি না, বাড়ির কাউকে একদিনও ফোন করতে পারিনি।
 
স্বামী হারানো নওগাঁ সদরের আয়েশা দুই সন্তানকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকতেন। গ্রামের দালালের খপ্পরে পড়ে বেশি বেতনের প্রলোভনে পড়ে সৌদি যান। স্বপ্ন ছিল সৌদিতে গিয়ে আয়ের টাকায় দুটি সন্তানের ভবিষ্যত তৈরি করবেন তিনি। কিন্তু তার সে স্বপ্ন এখন দাফনের পথে। গ্রামে ফিরবেন কি না তা তিনি জানেন না। তার ওপর যে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, তাতে তিনি সামাজিক লজ্জার ভয়ে নওগাঁ যেতেও পারছেন না।
 
আয়েশা জানান, তিনি দু বছর কাজ করেছেন, কিন্তু তাকে মাত্র ১৩ মাসের বেতন দেওয়া হয়েছে। বাকি ১১ মাসের কোনো বেতন তিনি পাননি। বেতনের কথা তুললেই মারধর করা হতো। তিনি কাজ করবেন না জানালে বাসার মালিক তাকে মারধর করে রাস্তায় ফেলে যান। পরে সৌদি পুলিশের কাছে তিনি আটক হয়ে এক সপ্তাহ জেল খেটে দেশে ফিরেন।
 
আয়েশা বলেন, টাকা রেখে জান নিয়ে চলে আসছি। মালিক মেরে রাস্তায়  ফেলে দিয়েছিল। টাকার কথা বললেই মারত। স্বামী যেতে দিবেনা, তাও গেছিলাম, তখন স্বামীর কথা শুনি নাই। নওগাঁ যে যাব কিভাবে সেটা ভাবছি।
 
অন্যদিকে, বরিশাল সদরের মালা বেগম (২৫)। তিনিও আয়েশা ও কুলসুমের সাথে সৌদি গিয়েছিলেন। যাওয়ার সময় এক প্রতিবেশীর কাছে ৩০ হাজার টাকা ধার করে সৌদি পাড়ি জমান। কিন্তু যাওয়ার পর থেকে বাড়িতে কোনো টাকা পয়সা পাঠাতে পারেননি।
 
খালি হাতে ফেরত আসার কারণে বেশির ভাগের হাতে মোবাইল ফোনও নেই। অনেকেই জানেন না রাতের বেলা তারা কোথায় যাবেন। নির্যাতনের শিকার হওয়া সৌদি আরব ফেরত এই নারীদের সহায়তা করতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির তথ্য কর্মকর্তা আল-আমিন। তিনি বলেন, যে নারীদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই তাদের ব্র্যাকের একটি সেন্টারে সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। আর যাদের যাওয়ার জন্য হাতে টাকা নেই সেই নারীদের আর্থিকভাবে সহায়তা করা হচ্ছে। অসুস্থ হয়ে কেউ ফিরলে তাদের চিকিত্সার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কয়েক দিন বেশি সময় আশ্রয় লাগলে অভিবাসন নিয়ে কর্মরত ওকাবের আশ্রয় কেন্দ্রে রাখা হচ্ছে। ব্র্যাকের এই কর্মকর্তা জানান, ব্র্যাকের পক্ষ থেকে ১২০ জনকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বরাবর আবেদন করা হয়, এর মধ্যে এ নিয়ে মোট ৯০ জন নারীকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।  -ইত্তেফাক

সর্বাধিক পঠিত

Comments

এই পেইজের আরও খবর

মোবাইল অ্যাপ ডাউনলোড করুন

nazrul